শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:০৭ অপরাহ্ন
Banner
আজকের শিরোনাম :

শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ‘ফ্যাটি লিভার’ রোগ

প্রতিনিধির নাম / ৮ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : July 23, 2026
শিশুদের মধ্যে উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে ‘ফ্যাটি লিভার’ রোগ

কয়েক দশক ধরে ফ্যাটি লিভার রোগকে মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকরা একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করছেন। ক্রমেই অনেক বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরী এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা অল্প বয়সি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল দীর্ঘমেয়াদি যকৃৎ বা লিভারের রোগে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় ভোগা শিশুদের মধ্যে এই রোগের হার অনেক বেশি।

শিশুদের ফ্যাটি লিভার রোগের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো এটি প্রায়শই কোনো শব্দ ছাড়াই বা নীরবে বিস্তার লাভ করে। অধিকাংশ শিশু পুরোপুরি সুস্থ বোধ করে এবং কোনো শারীরিক কষ্টের কথা জানায় না। অথচ তাদের লিভারের ভেতরে অলক্ষ্যে চর্বি জমতে থাকে, যা একসময় প্রদাহ এবং যকৃৎ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার দিকে নিয়ে যায়।

সময়মতো পরীক্ষা বা স্ক্রিনিং করা না হলে এই ‘টাইম বোম’ পরবর্তীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং লিভারের মারাত্মক জটিলতার মতো গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।

ফ্যাটি লিভার রোগের প্রকৃত কারণ

ফ্যাটি লিভারের কেস বৃদ্ধির পেছনে শুধু খাদ্যের চর্বিই একমাত্র কারণ নয়। শিশুদের ক্ষেত্রে গবেষণা দেখাচ্ছে যে, অতিরিক্ত স্থূলতা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সই হলো এই রোগের প্রধান চালিকাশক্তি।

খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়, প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট, আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত ক্যালোরিযুক্ত খাদ্য অস্বাস্থ্যকর ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকীয় জটিলতা তৈরি করে।

শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা: শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং দীর্ঘসময় স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

কিশোর-কিশোরীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যতালিকা থেকে অতিরিক্ত চিনি বাদ দেওয়ার মাত্র আট সপ্তাহের মধ্যে তাদের লিভারের চর্বি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং লিভারের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেছে।

অন্যান্য গবেষণায় দেখা গেছে, রান্নার তেল বা খাদ্যের চর্বির মতো কোনো একক উপাদান ফ্যাটি লিভারের একমাত্র কারণ নয়। বরং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণ, বিপাকীয় সমস্যা, বংশগত কারণ এবং কায়িক পরিশ্রমহীন জীবনযাত্রার যৌথ প্রভাব থেকেই এই রোগের সৃষ্টি হয়।

প্রতিরোধে করণীয় ও পুষ্টির ভূমিকা

ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধের প্রধান লক্ষ্য কেবল ওজন কমানো নয়, বরং বিপাকীয় স্বাস্থ্যের উন্নতি এবং পেটের চর্বি কমানো। ফলমূল, শাকসবজি, গোটা শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ, মাছ এবং অন্যান্য পুষ্টিকর সমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

একটি সুষম খাদ্য তৈরির জন্য স্বাস্থ্যকর চর্বি অপরিহার্য। ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাটের পরিবর্তে সুষম ফ্যাটি এসিড এবং অত্যাবশ্যকীয় ফ্যাটি এসিড সমৃদ্ধ চর্বি গ্রহণ করা উচিত—

ওমেগা-৩: সামুদ্রিক মাছের তেল, চিয়া বীজ, তিসি বা ফ্ল্যাক্স সিড, শণ বীজ।

ওমেগা-৬: পাম তেল, সয়াবিন, আখরোট, ডিম ও সূর্যমুখী তেল।

টোকোট্রিয়েনল: চিকিৎসায় সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত

সুষম খাদ্যে চর্বির ভূমিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন। তবে গবেষকরা বর্তমানে খাদ্যের ফ্যাটে প্রাকৃতিকভাবে বিদ্যমান কিছু বায়োঅ্যাক্টিভ উপাদান নিয়ে গবেষণা করছেন যা সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে সহায়তা করতে পারে। এমনই একটি উপাদান হলো ‘টোকোট্রিয়েনল’—যা ভিটামিন ই-এর একটি রূপ। এটি পাম তেলে প্রচুর পরিমাণে, ধানের কুঁড়ার তেলে (রাইস ব্রান অয়েল) মাঝারি পরিমাণে এবং অ্যানাটো বীজে অনন্যভাবে পাওয়া যায়।

পাম তেল একটি সুষম ফ্যাটি এসিড প্রোফাইলযুক্ত তেল এবং এটি টোকোট্রিয়েনলের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উৎস। এই ধরণের ভিটামিন ই-তে শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহবিরোধী গুণ রয়েছে।

প্রাণী ও মানুষের ওপর করা একাধিক গবেষণার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, টোকোট্রিয়েনল লিভারের চর্বি কমাতে, লিভারের কার্যক্ষমতার উন্নতি ঘটাতে এবং প্রদাহ ও টিস্যুর ক্ষতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।

যদিও চলমান গবেষণা ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ বা ব্যবস্থাপনায় টোকোট্রিয়েনলকে একটি দরকারী পুষ্টি সহায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবুও কোনো সাপ্লিমেন্ট বা সম্পূরক উপাদানই সুষম খাদ্য, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম, প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ কমানো, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্ক্রিন টাইম কমানোর বিকল্প হতে পারে না।

শৈশবের সঠিক জীবনযাত্রা শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর স্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাওয়ার অভ্যাসে উৎসাহিত করা, খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে সক্রিয় রাখা এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয় ও জাঙ্ক ফুড থেকে দূরে রাখা।

একইসঙ্গে সরকার ও সমাজকে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে সবার জন্য স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গ্রহণ করা সহজ ও সাশ্রয়ী হয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর