অনেকেই মুখের কালো দাগ নিয়ে চিন্তায় থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইপারপিগমেন্টেশন বা কালো ব্রণের দাগ, অত্যধিক সূর্যের এক্সপোজার বা হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হতে পারে। আরো বেশ কিছু কারণেও মুখের ত্বকে দাগ ছোপ দেখা দেয়।
সবাই চায় নরম কোমল ত্বক যা হবে ফ্রেশ আর উজ্জ্বল ঝলমলে। ত্বকের কালো দাগ আপনার অতি সুন্দর চেহারায় মলিনতা এনে দেবে একই সঙ্গে আপনার চেহারার সুন্দর অংশটুকুও ঢেকে ফেলবে।
আমেরিকার সান দিয়েগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন। আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান গবেষণা পত্রিকা ‘সায়েন্স ট্রান্সলেশনাল মেডিসিনে’ গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার)।
গবেষকরা জানিয়েছেন, এখন থেকে ত্বকের ব্রণ, র্যাশ কিংবা লাল বা কালো দাগ দ্রুত সারানো যাবে নতুন এক উপায়ে। তাদের মতে, ত্বকের নানা ধরনের ক্ষত বা প্রদাহ সারিয়ে তুলতে বড় ভূমিকা নেয় ত্বকের কোষ (ফাইব্রোব্লাস্টস)। ফাইব্রোব্লাস্টসের কোষগুলো চর্বি কোষ তৈরি করার সময়ই ক্যাথেলিসিডিন নামক এক ধরনের পেপটাইড (প্রোটিন) এর নিঃসরণ খুব বেড়ে যায়। এই ক্যাথেলিসিডিন কিন্তু ব্রণ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া দ্রুত ধ্বংস করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ওষুধ দিয়ে বা অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিতে শরীরে ক্যাথেলিসিডিনের নিঃসরণ বাড়ানোর মাধ্যমেই ত্বকের ব্রণ, র্যাশ কিংবা লালচে বা কালো পুরোপুরি সারিয়ে তোলা যাবে। তাও আবার খুব দ্রুত।
রোদ : ত্বকের নিদাগ উজ্জ্বলতার সবচেয়ে বড়ো শত্রু হচ্ছে সূর্যের চড়া আলো। রোদে বেরনোর আগে অতি অবশ্যই মুখসহ শরীরের সব খোলা অংশে সানস্ক্রিনের প্রলেপ লাগান। সাঁতার কাটার সময় ব্যবহার করুন ওয়াটারপ্রুফ সানস্ক্রিন।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা : হরমোনের অতিরিক্ত বেশি বা কম ক্ষরণের জন্য আপনার ত্বকে গাঢ়রঙের দাগ-ছোপ পড়তে পারে। প্রেগন্যান্সি বা মেনোপজরে কারণেও হরমোনের স্তরে ভারসাম্যের অভাব দেখা দেয়। এর ফলে মেলানিনের উৎপাদনেও সাম্য থাকে না। ফলে মুখে, কাঁধে, গলায় ছোপ-ছোপ দাগ দেখা দিতে পারে।
ত্বককে রোমহীন রাখার অনন্ত প্রচেষ্টা : বহু মহিলাই ত্বকের বাড়তি রোমের আস্তরণ সরিয়ে ফেলতে চান। সে কারণে রোম তোলার ক্রিম, টুইজার, ওয়্যাক্স ইত্যাদি নানা পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হয়। কিন্তু নিরন্তর এই প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ত্বকের স্পর্শকাতরতা বাড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে দাগ-ছোপের আশঙ্কাও।
ব্রণ বা চোট-আঘাতের দাগ: ব্রণ বা ফোড়া হলে খুঁটবেন না, হাত লাগাবেন না বেশি। তা হলে কিন্তু দাগ চট করে মিলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।
লেবুর রস আর জলের মিশ্রণ: একমাত্র আপনার চোখের চারপাশটা বাদ দিয়ে মুখে বা গলার অন্যত্র প্রতি একদিন অন্তর লেবুর রস আর জলের মিশ্রণটা লাগিয়ে দেখতে পারেন। চলতে পারে লেবুর রস আর মধুর মিশ্রণও। লেবু প্রাকৃতিক ব্লিচ হিসেবে কাজ করে। এর সাইট্রিক অ্যাসিড আর ভিটামিন সি ক্রমশ গাঢ় কালো ছোপ হালকা করে দেয়। আপনার ফেস মাস্কেও লেবুর রস ব্যবহার করতে পারেন।
ভিটামিন ই তেল: যদি আপনার ভিটামিন ই তেলে কোনও অ্যালার্জি থাকে, তা হলে আলাদা কথা। না হলে দাগ-ছোপে সরাসরি তা ব্যবহার করে দেখতে পারেন। তবে যাঁদের ব্রণর ধাত আছে, তাঁরা আমন্ড, সানফ্লাওয়ার সিডস, শুকনো অ্যাপ্রিকট ইত্যাদি রাখুন খাদ্যতালিকায়।
আলুর রস: আলু খুব ভালো করে ধুয়ে ছেঁচে রস বের করে নিন। তার পর সরাসরি সেই রস লাগিয়ে নিন দাগ-ছোপে। মিনিট দশেক অপেক্ষার পর ধুয়ে ফেলতে পারেন। ফেস প্যাক বানানো যায় আলুর রস, মধু আর লেবুর রস দিয়েও।
অ্যালোভেরা জেল : ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরা জেল ক্ষত নিরাময় থেকে ময়শ্চারাইজিং সমস্ত কিছুতে দারুণ উপকারী। মুখের কালো দাগ দূর করতেও এটি খুব ভাল। আপনি সরাসরি গাছ থেকে অ্যালোভেরা ব্যবহার করতে পারেন বা বাজার থেকে অ্যালোভেরা জেল কিনতে পারেন। এটি ব্যবহার করার জন্য, অ্যালোভেরার রস বা প্রাকৃতিক অ্যালোভেরা জেল সরাসরি ত্বকের হাইপারপিগমেন্টেড এলাকায় প্রয়োগ করুন। এটি সকাল এবং সন্ধ্যায় ৩০ মিনিট মতো মুখে রাখুন এবং এরপর হালকা গরম জল দিয়ে মুখ ধুয়ে নিন। অ্যালোভেরা জেল দিয়েও একটি প্যাক তৈরি করতে পারেন। একটি প্যাক তৈরি করতে অ্যালোভেরা গাছের পাতা থেকে জেল বের করে নিন। এরপরে,তাজা কুড়িয়ে নেওয়া শসা, লেবুর রস, ১ চামচ চন্দন গুঁড়ো যোগ করুন এবং ভাল ভাবে মেশান। এটি ত্বকে প্রয়োগ করুন এবং সম্পূর্ণরূপে শুকিয়ে নিন। এরপর বরফ-ঠান্ডা জল দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিন।
হলুদ গুঁড়ো : ত্বকের কালো দাগ হালকা করতে হলুদের গুঁড়ো দারুণ উপাদান। দ্রুত ফলাফল পেতে আপনি একটি ফেসপ্যাক ব্যবহার করতে পারেন। ১ চা চামচ হলুদের গুঁড়োর সঙ্গে ১-২ চা চামচ দুধ এবং ১ চা চামচ লেবুর রস মিশিয়ে নিন। এই তিনটি উপাদান মিলিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ তৈরি করুন। মুখে ২০ মিনিটের জন্য এই ফেসপ্যাক রেখে, হালকা গরম জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন এবং ময়েশ্চারাইজার লাগাতে ভুলবেন না। আপনি দুই সপ্তাহের জন্য নিয়মিত এটি ব্যবহার করতে পারেন এবং অল্প সময়ের মধ্যে ত্বকের পার্থক্য দেখতে পাবেন আপনি।
আপেল সিডার ভিনেগার : আপেল সাইডার ভিনেগারে অ্যাসিটিক অ্যাসিড রয়েছে যা স্কিন পিগমেন্টেশন হালকা করতে এবং ত্বকের সামগ্রিক চেহারা উন্নত করতে সাহায্য করে। এই প্রতিকারটি ব্যবহার করার জন্য আপনাকে একটি পাত্রে সমান পরিমাণে আপেল সিডার ভিনেগার এবং জল মেশাতে হবে। আপনার গাঢ় দাগে প্রয়োগ করুন এবং ৫ থেকে ৭ মিনিট রেখে দিন। এরপরে, হালকা গরম জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন এবং ময়েশ্চারাইজার লাগান। আপনি চাইলে ভিনেগারের সঙ্গে কয়েক ফোঁটা লেবুর রস মিশিয়ে নিতে পারেন।
চন্দন : চন্দনের জাদুকরী গুণ রয়েছে। এটিতে অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা, দাগ এবং ব্রণ কমাতে করতে সহায়তা করে। আপনাকে শুধু ১ চা চামচ চন্দন গুঁড়ো, কয়েক ফোঁটা নারকেল তেল এবং কমলা লেবুর রস যোগ করতে হবে। এই সমস্ত উপকারণের মসৃণ পেস্ট না পাওয়া পর্যন্ত আপনি আরও কমলালেবুর রস যোগ করতে পারেন। এবার প্যাকটি আপনার মুখে লাগান এবং ১৫ মিনিটের জন্য রেখে দিন। এরপর হালকা গরম জল দিয়ে মুখ ধুয়ে, ময়েশ্চারাইজার লাগান।
পেঁপে : পেঁপেতে প্যাপেইন নামক এনজাইম রয়েছে যা ত্বকের টোনকে ভারসাম্যপূর্ণ করে এবং ত্বককে এক্সফোলিয়েট করে। সবুজ পেঁপে থেকে বীজ খোসা ছাড়িয়ে নিন। পেঁপের পাল্প ব্যবহার করুন। সকালে উঠে এবং রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ২০-৩০ মিনিটের জন্য ডার্ক স্পটের স্থানে প্রয়োগ করুন। হালকা গরম জল দিয়ে ধুয়ে ময়েশ্চারাইজার লাগান। এই সৌন্দর্য প্রতিকারগুলির যে কোনও একটি ব্যবহার করার আগে অবশ্যই একটা জিনিস মাথায় রাখতে হবে। প্রথমে মুখে অল্প পরিমাণে লাগান এবং অল্প সময়ের জন্য রেখে দিন। যদি কোনও অস্বস্তি অনুভব না করেন, বেশি করে প্যস্ক লাগাতে পারে। তবে কোনও সমস্যা বোধ করলে, অবিলম্বে মিশ্রণটি ধুয়ে ফেলুন। মনে রাখবেন যে, আপনি যখন এই প্রাকৃতিক প্রতিকারগুলি ব্যবহার করছেন তখন ডার্ক স্পট কমানোর জন্য, চেষ্টা করুন যতটা সম্ভব সরাসরি সূর্যের আলোতে না আসতে।