গরম আর বর্ষা এলেই মশার উপদ্রব যেন কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা নামলেই ঘর, বারান্দা কিংবা বাইরে সব জায়গাতেই বসা কঠিন হয়ে পড়ে।
মশা তাড়ানোর জন্য স্প্রে বা কয়েল ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি আছে প্রাকৃতিক উপায়। বিশেষ করে এসেনশল অয়েল বা উদ্ভিজ্জ তেল হতে পারে ভালো বিকল্প।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কীটতত্ত্ববিদ ট্রেন্ট ফ্রেজার রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, কিছু এসেনশল অয়েল সত্যিই মশা দূরে রাখতে সাহায্য করে। তবে এগুলোর কার্যকারিতা এবং সুরক্ষার সময় অনেকটাই নির্ভর করে তেলের মান, ব্যবহার পদ্ধতি ও পুনরায় প্রয়োগের ওপর।
যেভাবে কাজ করে এই তেল
মশা সাধারণত মানুষের শরীরের গন্ধ, ঘাম এবং নিঃশ্বাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রতি আকৃষ্ট হয়।
ট্রেন্ট ফ্রেজারের মতে, এসেনশল অয়েল এসব গন্ধকে আড়াল করে দেয়। ফলে মশা সহজে মানুষকে শনাক্ত করতে পারে না।
তবে সমস্যা হল, প্রাকৃতিক তেল দ্রুত উড়ে যায় বা বাতাসে মিশে যায়। ফলে এর কার্যকারিতাও বেশি সময় স্থায়ী হয় না।
এজন্য বারবার ব্যবহার করতে হয় অথবা এমনভাবে তৈরি করতে হয় যাতে এটি দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে।
লেমন ইউক্যালিপটাস সবচেয়ে কার্যকর
আরেক মার্কিন কীটতত্ত্ববিদ শ্যানন হারলো-এলিস বলেন, লেমন ইউক্যালিপটাস তেল সবচেয়ে কার্যকর প্রাকৃতিক বিকল্পগুলোর একটি।”
তার মতে, এই তেল প্রায় ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত মশা দূরে রাখতে পারে।
ট্রেন্ট ফ্রেজারও জানান, গবেষণায় দেখা গেছে লেমন ইউক্যালিপটাস তেলের কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রে কম মাত্রার রাসায়নিক মশা নিরোধকের কাছাকাছি।
এই তেলের গন্ধ তীব্র হওয়াতে মশা সহজে কাছাকাছি আসে না। তবে এটি ব্যবহারের আগে ত্বকে পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি, কারণ জ্বালাপোড়াও হতে পারে।
মশা তাড়ানোর ক্ষেত্রে সিট্রোনেলা পরিচিত নাম। অনেকেই মোমবাতি বা তেলের আকারে এটি ব্যবহার করেন।
শ্যনন হারলো-এলিস বলেন, সাধারণভাবে সিট্রোনেলা তেলের কার্যকারিতা প্রায় এক ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে।
বিশেষ করে খোলা জায়গা বা বারান্দায় সিট্রোনেলা মোমবাতি ব্যবহার করলে কিছুটা উপকার পাওয়া যায়। তবে এটি একা খুব দীর্ঘ সময় সুরক্ষা দিতে পারে না।
অনেকেই সুগন্ধের জন্য ল্যাভেন্ডার বা পুদিনার তেল ব্যবহার করেন। এসব তেলেও মশা দূরে রাখার কিছু ক্ষমতা আছে।
তবে ট্রেন্ট ফ্রেজারের মতে, এগুলোর কার্যকারিতা তুলনামূলক কম এবং সাধারণত আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হয় না।
তবুও যারা হালকা প্রাকৃতিক সুগন্ধ পছন্দ করেন, তারা এই তেল ব্যবহার করতে পারেন। বিশেষ করে ঘরের ভেতর বা অল্প সময়ের জন্য বাইরে বসার ক্ষেত্রে এগুলো কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব এসেনশল অয়েলের মান একরকম নয়। তেল কোন উদ্ভিদ থেকে তৈরি, কীভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে, কতটা বিশুদ্ধ এবং এতে অন্য কোনো উপাদান মেশানো হয়েছে কি না— এসবের ওপর কার্যকারিতা নির্ভর করে।
ট্রেন্ট ফ্রেজার পরামর্শ দেন, তেল কেনার সময় বোতলের গায়ে থাকা উদ্ভিদের বৈজ্ঞানিক নাম দেখে নেওয়া উচিত।
যেমন- লেমন ইউক্যালিপটাস তেলের ক্ষেত্রে ‘কোরিম্বিয়া সিট্রিওডোরা’ বা ‘ইউক্যালিপটাস সিট্রিওডোরা’ লেখা থাকলে বোঝা যাবে এটি সঠিক উদ্ভিদ থেকে তৈরি।
এছাড়া কৃত্রিম সুগন্ধি বা রাসায়নিক উপাদান মেশানো আছে কি-না, সেটিও দেখে নেওয়া জরুরি।
এসেনশল অয়েল সরাসরি ত্বকে ব্যবহারের আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ কিছু তেল ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে।
এই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথমে হাতে বা কানের পেছনে অল্প পরিমাণ লাগিয়ে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো। কোনো সমস্যা না হলে এরপর ব্যবহার করা যেতে পারে।
শ্যনন হারলো-এলিসের মতে, গলা, কবজি, কনুইয়ের ভেতরের অংশ, হাঁটুর পেছনে এবং গোড়ালিতে তেল ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
এদিকে ট্রেন্ট ফ্রেজার বলেন, শুধু শরীরে নয়— কাপড়ের কিনারা, জুতা কিংবা বাইরের পর্দাতেও এসব তেল ব্যবহার করা যায়।
বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলছেন, শুধু এসেনশল অয়েলের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। বিশেষ করে যেখানে মশার সংখ্যা বেশি বা মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি আছে, সেখানে এটি একমাত্র সমাধান হতে পারে না।
বরং এটি একটি বড় সুরক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। ঘরের চারপাশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা, মশারি ব্যবহার এবং প্রয়োজন হলে কার্যকর মশা নিরোধক ব্যবহার করাই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।