নিজস্ব প্রতিবেদক :
জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শনিবার (১১ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ৮০ বছর পূর্তি ও ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘ডিএমসি ডে-২০২৬’ এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
তারেক রহমান বলেন, আমরা উপজেলা পর্যায়েও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে চাই। সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে চিকিৎসক, চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাইকে সম্মিলিতভাবে স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হওয়ার প্রবণতা কমাতে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালের সেবার মান বাড়ানো জরুরি। এই লক্ষ্যেই সরকার স্বাস্থ্যখাতের অবকাঠামো উন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আয়োজিত প্রশ্নোত্তর পর্বে চিকিৎসকরা স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন সমস্যা ও চলমান চ্যালেঞ্জ প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। জবাবে তিনি সরকারের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন এবং রাজধানীকেন্দ্রিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চিকিৎসকদের শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও সমান গুরুত্ব দিয়ে সেবা দেওয়ার আহ্বান জানান।
তারেক রহমান বলেন, সরকারি পর্যায়ে দেশে ২৫ হাজার ধাত্রী নিয়োগ করা হবে। তারা মায়েদের নরমাল ডেলিভারিকরাতে উৎসাহ দেবেন। এছাড়া ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী ও ২৫ হজার মিডওয়াইফ নিয়োগ করা হবে।
তিনি বলেন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে ৫১ বেডের হাসপাতালগুলো ১০০ বেডে উন্নিত করা হবে। সরকারি চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়। গ্রাম থেকে অধিক সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসার জন্য যেন ঢাকায় আসতে না হয়, এজন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রান্তিক পর্যায়ে রোগীদের সেবা দেওয়ার আহŸান জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের চিকিৎসকরা আমার মাকে যে সেবা দিয়েছেন, সেটা বিদেশে পাওয়া যেত না। কয়েকজন চিকিৎসক আমার মাকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে চিকিৎসা দিয়েছেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তিনি চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। তাকে আবার বিদেশে নেওয়ার ব্যাপারে যখন কথা চলছিল, আমি বলেছিলাম, এখন যারা সেবা দিচ্ছেন, এই হিউম্যান টেককেয়ার বিদেশে পাওয়া যাবে না।
চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমি দেখেছি, আমাদের চিকিৎসকরা মাকে যে সেবা দিয়েছেন, সেটা বিদেশে পাওয়া যেত না। এজন্য আমি মানুষগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, চব্বিশের আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অকাতরে জীবন দিয়েছেন। এই মেডিকেল কলেজ শুধু ডাক্তার তৈরি করেনি, সমাজনেতাও তৈরি করেছে। ঢাকা মেডিকেল এখন রাজধানীর মানুষের নির্ভরতার প্রতীক।
তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশে বলেন, যারা চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন, প্রত্যেকের মানুষের মনোজগতে আপনারা এমন একজন মানুষ, যাদের কাছে আমরা ভরসা করি। যাকে পরম বন্ধু ভাবি। একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে আকেরজনের কাছে যায়, তখন তার ওপর পরম ভরসা করে বলেই যায়।
প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউরÑএর ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন রোগীকে চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রের যে খরচ হয়, রাষ্ট্র যদি প্রিভেনশনের ব্যবস্থা নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের খরচ অনেক কম হয়। আমরা এ দিকে মনোযোগ দিয়েছি।
তিনি বলেন, হেলথকেয়ারারকে আমরা বিশেষ প্রশিক্ষণ দেব, তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে মানুষকে সচেতন করবেন। যাতে রোগ-বালাই কম হয়, সেদিকে তারা জোর দেবেন।
আজকের শিক্ষার্থী-ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, সরকার স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, জনবল বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের মানুষের জন্য আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
চিকিৎসক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা প্রতিদিনই মানুষের অনেক আনন্দ-বেদনার সাক্ষী। যারা চিকিৎসা পেশায় নিয়োজিত কিংবা চিকিৎসক হওয়ার জন্য অধ্যয়নরত, প্রতিটি মানুষের মনোজগতে আপনাদের অবস্থান তাদের সুস্থ জীবনের রক্ষক হিসেবে বিবেচিত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ উপলব্ধি থেকেই সম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের একটি অনুষ্ঠানে আমি বলেছিলাম, চিকিৎসকগণই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। চিকিৎসকগণই রোগে-শোকে কাতর মানুষটির পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহারও একজন রোগীর কাছে ওষুধের মতো কার্যকরী হয়ে ওঠে। সুতরাং একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগত উৎকর্ষতার পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।
হাসপাতালের নিরাপত্তা জোরদারের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
‘Prevention is better than cure’- এই নীতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে চায়। পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো বিষয়গুলোতে আগেভাগে স্বাস্থ্যসম্মত পরামর্শ পেলে রোগের নিরাময় অনেক সহজ হয়। নিয়মিত পরীক্ষা, সচেতনতা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক রোগ শুরুতেই নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় সম্ভব।

এ লক্ষ্যেই সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তাদের মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী হেলথ কেয়ারার হবেন, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন। তিনি বলেন, একটি সুস্থ জাতি শুধু হাসপাতাল দিয়ে গড়ে ওঠে না; পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, স্বাস্থ্য পরামর্শ, নিরাপদ খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম ও দায়িত্বশীল জীবনাচরণের ওপরও শারীরিক সুস্থতা নির্ভর করে।
স্বাস্থ্যখাতে বাজেট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাখাতের পর এবার দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্যখাতে। চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে এ বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শুধু বাজেট বাড়ানো নয়, বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও চিকিৎসা ব্যয়ও কমানো হয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের বিষয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের ৫০০ উপজেলার মধ্যে বর্তমানে মাত্র পাঁচটিতে ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। জনসংখ্যার তুলনায় এটি অপ্রতুল হওয়ায় রোগীদের শহরমুখী হতে হয়। এ কারণে বর্তমানে ৩১ থেকে ৫১ শয্যার প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সব হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকার হাসপাতালের ভবন নির্মাণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের শিশুরাই আগামীর বাংলাদেশ। শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে বিশেষায়িত শিশুচিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজলভ্য হবে।
মেডিকেল শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও চিকিৎসকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিকেল বর্জ্যের বিজ্ঞানসম্মত অপসারণ ও ব্যবস্থাপনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সবাইকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে মেডিকেল বর্জ্য অপসারণ এবং হাসপাতালগুলো পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, আজকের শিক্ষার্থী ও ইন্টার্নদের হাত ধরেই চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখিতা বন্ধ হবে।