বরিশাল জেলা প্রতিনিধি :
আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগাবে সরকার। তবে শুধু রোপণ করলেই হবে না, যত্নও নিতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (১৩ জুলাই) সকালে বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোর ইউনিয়নে নবখননকৃত সরিকল-বাটাজোর খালের পাড়ে সরকারের ঘোষিত ‘পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় গাছ লাগাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এখন আগের তুলনায় বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ব্যাপক বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই।
একটি শিশুকে যেমন আদর-যত্নে বড় করে তুলতে হয়, তেমনি একটি গাছকেও পরিচর্যার মাধ্যমে বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু চারা রোপণ করলেই হবে না, গাছের যত্ন নিশ্চিত করলেই বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রকৃত সুফল পাওয়া যাবে।
তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে সরকার খাল পুনঃখনন ও বৃক্ষরোপণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় সারাদেশে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে যে পরিমাণ গাছ থাকা দরকার, তা নেই উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশ-জলবায়ুর যেসব সমস্যার মুখোমুখি বাংলাদেশ, তার সমাধানে সারা দেশে অনেক গাছ লাগাতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তুলে ধরে সরকারপ্রধান বলেন, আগে যেমন শীত পড়ত এখন তেমন পড়ে না, আবার গরমও বেড়েছে। কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও দীর্ঘ সময় বৃষ্টি নেই। এই পরিস্থিতির প্রভাব কমাতে সারা দেশে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই।
তারেক রহমান বলেন, আজ আড়াই হাজার গাছের চারা রোপণ করা হচ্ছে। তবে চারা লাগিয়েই চলে গেলে হবে না। একটি শিশুকে যেমন বড় করে তুলতে হয়, তেমনি গাছকেও পরিচর্যা করতে হবে। গাছ বড় হলে ছায়া দেবে, বিশুদ্ধ বাতাস দেবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।
পরিবেশের যত্ন নিতে ও যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, দেশ সবার, তাই দেশের যত্ন সবার করতে হবে। দেশের পরিবেশ নষ্ট হলে দেশের ছোট-বড় সব মানুষেরই ক্ষতি।
তারেক রহমান বলেন, আমাদের দেশের যত্ন আমাদেরকেই নিতে হবে, আমাদের দেশকে আমাদেরই গড়ে তুলতে হবে। সুতরাং সবাই মিলে যদি চেষ্টা করি, সচেতন হই, তাহলে আমাদের পরিবেশটা সুন্দর করতে পারবো। আমাদের পরিবেশটা সুন্দর করতে পারলে ভবিষ্যৎ বংশধররা একটি সুন্দর জায়গায় থাকতে পারবে।
এসময় তিনি বলেন, আপনারা জনগণ এই দেশের মালিক। সুতরাং এই দেশের জনগণ, অর্থাৎ এই ঘরের মালিক হিসেবে ঘরের যত্ন আমাদের সকলেরই করতে হবে।
বক্তব্য চলাকালে সামনের খালে ভাসতে থাকা প্লাস্টিকের বোতল দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব জায়গায় যদি ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়, তাহলে খাল-বিল সব বন্ধ হয়ে যাবে। আর খাল-বিল যদি চালু থাকে, পানি প্রবাহিত হয়, তাহলে উপকার এই এলাকার মানুষই পাবে। অর্থাৎ সারা দেশের খাল-বিল যদি ঠিকঠাক থাকে, তাহলে বন্যার সময় ক্ষতি কম হবে। রাস্তা দিয়ে আসার সময় দেখলাম, যেখানে যেখানে বাজার আছে, সেখানকার আশপাশে বিভিন্ন ধরনের কাগজ, পলিথিন, প্লাস্টিকের ব্যাগ, বোতল ফেলে পরিবেশটা নষ্ট করা হচ্ছে। পরিবেশ যদি নষ্ট হয়, তাহলে ক্ষতি আমাদেরই হবে। ঢাকা শহরে গাড়ির ধোঁয়া, ট্রাকের ধোঁয়া, ইঞ্জিনের ধোঁয়া, ময়লার কারণে মানুষের শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কিন্তু গ্রামে আসলে কিছুটা ভালো লাগে, বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। কিন্তু আবর্জনা দিয়ে সব জায়গা ভরে যায়, তাহলে গোটা দেশের পরিবেশ নষ্ট হবে। তখন ছোট-বড় সব মানুষের ক্ষতি হবে, শ্বাস নিতে কষ্ট হবে, বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ হবে। আমরা এখানে উপস্থিত মিডিয়ার ভাই-বোনদের মাধ্যমে দেশের সমগ্র মানুষকে অনুরোধ করি—আসুন, আমরা চেষ্টা করি যেখানে-সেখানে আবর্জনা না ফেলতে। আমাদের কোনো ব্যবহার্য জিনিসের ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেলে, অর্থাৎ পানি খেয়ে পানির বোতল কিংবা প্যাকেটের ব্যবহার শেষ হলে সেটি যেখানে-সেখানে না ফেলি। এতে আমাদের পরিবেশটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পরিবেশটা নষ্ট হয়ে গেলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি, পরবর্তীতে আমাদের সন্তানেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমরা নিজে যদি নিজের ঘর নিজে পরিষ্কার না রাখি, নিজের দেশটাকে নিজে ঠিক না রাখি, তাহলে বাইরের দেশ থেকে কেউ এসে ঠিক করে দেবে না।
তিনি বলেন, আমাদের দেশকে সুন্দর করতে হলে সবাইকে চেষ্টা করতে হবে। একটি ঘর ৪/৫ জন মানুষ অপরিষ্কার রাখলে একজন মানুষের পক্ষে তা পরিষ্কার করে গুছিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তেমনি দেশের ক্ষেত্রেও সম্ভব নয়। আসুন, আজ থেকে আমরা চেষ্টা করি যত্রতত্র ময়লা ফেলবো না। প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে ফেলে দিতে হলে একটি নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলবো। এই প্রতিজ্ঞা ও চেষ্টা আমাদের করতে হবে।
পকেট থেকে টিস্যু বের করে উপস্থিতিদের দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার পকেটে হাত দিলে টিস্যু বের হবে, যা দিয়ে কিছুক্ষণ আগে হাতের মাটি মুছেছি। এখন যদি এখানে ফেলে দিই, তাহলে আপনাদের যা বলেছি, তা তো আমিই নিজে মানলাম না। ছোটবেলা থেকে আমি অভ্যাস করেছি, টিস্যু ব্যবহার করে পকেটের মধ্যে রেখে দিই। আমার প্যান্টের পকেটে হাত দিলেই টিস্যু পাওয়া যাবে। রাতে যখন বাসায় যাই, তখন সারাদিনের ব্যবহৃত টিস্যু ডাস্টবিন নয়তো ময়লা ফেলার স্থানে ফেলে দিই। আমি চেষ্টা করেছি, তাই অভ্যাসটা নিজের মধ্যে গড়ে তুলতে পেরেছি। তাই চেষ্টা করলে আমরা সবাই যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলা বন্ধ করতে পারবো। তখন পরিবেশ সুন্দর হয়ে যাবে এবং নিজের দেশের পাশাপাশি বিদেশের মানুষও প্রশংসা করবে।
তিনি বলেন, আজ আমি আপনাদের সামনে রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য দিলাম না। কারণ রাজনৈতিক বক্তব্যের থেকে নিজের দেশের জন্য ভালো কিছু করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
এসময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও দলীয় নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক ধরে বরিশালের গৌরনদীর ভূরঘাটা এলাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পৌঁছান। সরকার গঠনের পর এটিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রথম বরিশাল সফর। এসময় তাঁর গাড়িবহরকে বরিশাল জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানান স্থানীয় প্রশাসন ও বিএনপির নেতাকর্মীরা। পরে তাঁরা গাড়িবহর নিয়ে গৌরনদী পৌরসভার কর্মসূচিস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। গোটা সড়কপথের দুই পাশে বিএনপির নেতাকর্মী ও স্থানীয়রা দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।