নিজস্ব প্রতিবেদক :
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানিয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে এবং গতি সঞ্চারে এডিপি বড় ভূমিকা রাখে। এটি ঠিকমতো হলে দেশি-বিদেশি নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হবে।
বুধবার (২২ জুলাই) সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে একনেক সভা-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বেশকিছু প্রকল্পের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরাসরি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তদন্ত রিপোর্টের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি বলেন, আইএমইডি’র সাম্প্রতিক রিপোর্ট পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং পিডি (প্রকল্প পরিচালক) নিয়োগের নীতিমালার খসড়া নিয়ে আলোচনা চলছে। এগুলো শেষ হলে একটি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নির্দেশিকা তৈরি হবে, যা ভবিষ্যতে প্রকল্পগুলো সুষ্ঠুভাবে চালাতে সাহায্য করবে। নতুন সরকারের মেয়াদের অল্প সময়েও পুরনো কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ইতিবাচক পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। তবে আইনি বা নীতিগত পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়; সমন্বয়ের মাধ্যমে একটা ভালো পরিবেশ তৈরির কাজ চলছে।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণে ব্যবহৃত বিদ্যমান রেট শিডিউল পর্যালোচনা করে নতুন কাঠামো তৈরির কাজ চলছে বলে জানিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াকে সময়োপযোগী ও যৌক্তিক করতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও বাস্তবায়ন নির্দেশিকা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে। এ বিষয়ে আইএমইডি একটি প্রতিবেদন দিয়েছে, যা পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের নতুন নীতিমালার খসড়াও প্রস্তুত হয়েছে।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা হবে।
জোনায়েদ সাকি জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার পৃথক রেট শিডিউল ব্যবহারের কারণে ব্যয় নির্ধারণে নানা প্রশ্ন তৈরি হওয়ায় বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। এ জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। শিগগিরই তারা নতুন রেট শিডিউলের সুপারিশ দেবে। নতুন কাঠামোয় সাধারণ কাজের জন্য অভিন্ন হার এবং বিশেষায়িত কাজের জন্য পৃথক হার নির্ধারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন রেট শিডিউল কার্যকর হলে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ আরও স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের উন্নয়ন প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নও আরও কার্যকর হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে একটি প্রকল্প ধারণাপত্র থেকে সম্ভাব্যতা যাচাই, ডিপিপি প্রণয়ন, একনেকের অনুমোদন, প্রশাসনিক আদেশ, দরপত্র এবং কার্যাদেশ সম্পন্ন হতে প্রায় দেড় থেকে দুই বছর সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু হতেও তিন থেকে চার বছর লেগে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে এডিপি বাস্তবায়ন ধীরগতির হয় এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল অর্জন ব্যাহত হয়।
মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের বিলম্ব, বারবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্বল জবাবদিহির সংস্কৃতি ভেঙে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতি ও স্বচ্ছতা আনতে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে চারটি প্রধান ক্ষেত্রে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম বা অবহেলার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল জবাবদিহি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে দীর্ঘদিন ধরে অনেক মেগা প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ করা সম্ভব হয়নি। এসব প্রকল্পে কী কারণে বিলম্ব হয়েছে এবং কোথায় কী ধরনের ত্রুটি ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা খুলনার রূপসা এলাকার একটি সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি জমা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সব ক্ষেত্রে ব্যয় বৃদ্ধি অনিয়মের কারণে হয় না। অনেক সময় আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি, ডলারের বিনিময় হার, কর ও ভ্যাট কাঠামোর পরিবর্তন, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর কিংবা প্রকল্পে নতুন উপাদান যুক্ত হওয়ার কারণে ব্যয় বাড়ে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, ইউটিলিটি স্থানান্তরসহ বিভিন্ন বাস্তব কারণে প্রকল্পটির ব্যয় সংশোধন করতে হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কবরস্থান, শ্মশান ও বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ের সংস্কার ও উন্নয়নের নতুন চাহিদা যুক্ত হওয়ায় এ প্রকল্পেও অতিরিক্ত ৩৬৮ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়েছে। সংশোধনের পর প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা।
জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে চারটি বড় সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে প্রথমেই আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য একটি কৌশলগত কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা শিগগির প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি, ব্যয় এবং সময়সীমা তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড চালু করা হবে।
তিনি বলেন, যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রকল্প পরিচালকদের জন্য প্রশিক্ষণ ও বিশেষ কোর্স মডিউলও চালু করা হবে, যাতে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ে এবং বাস্তবায়নে বিলম্ব কমে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপ্রয়োজনীয় বা একই ধরনের পুনরাবৃত্ত প্রকল্প বাদ দিতে সব চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। যাচাই-বাছাই শেষে প্রয়োজনীয় প্রকল্পগুলো সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
তিনি জানান, উন্নয়ন প্রকল্প ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক ও স্বচ্ছ করতে পরিকল্পনা বিভাগ, সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল সেবাগুলোকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই সমন্বিত ব্যবস্থা চালু হলে প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ আরও স্বচ্ছ, দ্রুত এবং জবাবদিহিমূলক হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।