শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৩ অপরাহ্ন
Banner
আজকের শিরোনাম :

ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিরাময়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাই মূল চাবিকাঠি : বিশেষজ্ঞগণ

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) / ৬ বার দেখা হয়েছে
আপডেট : July 23, 2026
ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা নিরাময়ে দ্রুত শনাক্তকরণ ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাই মূল চাবিকাঠি : বিশেষজ্ঞগণ

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) : 

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট টিবি বা ডিআর-টিবি) এখন কার্যকরভাবে নিরাময়যোগ্য। তবে অজ্ঞতা, সামাজিক কুসংস্কার এবং চিকিৎসায় অবহেলা এখনও যক্ষ্মামুক্ত বিশ্ব গড়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির এই সাফল্যের পাশাপাশি সামাজিক চ্যালেঞ্জের বাস্তব চিত্র বাংলাদেশেও স্পষ্ট। যক্ষ্মা মোকাবিলায় বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সফল দেশের স্বীকৃতি অর্জন করেছে।

শ্বাসতন্ত্রের রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. দেওয়ান আজমল হোসেন বলেন, ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট টিবির চিকিৎসায় বাংলাদেশ এখন বিশ্বে একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। দেশে এই রোগের চিকিৎসা-সফলতার হার ৯০ শতাংশেরও বেশি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত ও বাস্তবায়িত বিপিএএল এবং বিপিএএলএম পদ্ধতি-ড্রাগ-প্রতিরোধী যক্ষ্মার জন্য স্বল্পমেয়াদি সম্পূর্ণ মুখে খাওয়ার ওষুধভিত্তিক চিকিৎসা বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জীবন রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

অধ্যাপক আজমল হোসেন বলেন, দেশে শক্তিশালী চিকিৎসা অবকাঠামো এবং ৪৬০টিরও বেশি উপজেলায় জিনএক্সপার্ট পরীক্ষার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও মানুষের মানসিক বাধাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তার ভাষায়, সমস্যা চিকিৎসা ব্যবস্থায় নয়; বরং সচেতনতার অভাব ও সামাজিক কলঙ্কের কারণে অনেক রোগী উপসর্গ গোপন করেন বা রোগ নির্ণয় মেনে নিতে চান না।

তিনি বলেন, রোগীর নিজের সচেতনতাই প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। আগে যক্ষ্মায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত ক্ষুধা ও শারীরিক শক্তি ফিরে পাওয়ার মাধ্যমে সুস্থতার লক্ষণ বুঝতে পারেন। যদি নিয়মিত ওষুধ সেবনের পরও এই স্বাভাবিক সুস্থতা ফিরে না আসে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ-প্রতিরোধের বিষয়টি সন্দেহ করতে হবে।

অধ্যাপক আজমল চিকিৎসকদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুলের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, অনেক সময় কফ পরীক্ষার মাধ্যমে জীবিত জীবাণুর উপস্থিতি নিশ্চিত না করেই এক্স-রেতে দেখা স্থায়ী দাগ বা পোস্ট-টিবি লাং ডিজিজকে সক্রিয় যক্ষ্মা ধরে ওষুধ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন, ওষুধের ডোজ বাদ দেওয়া বা নির্ধারিত সময়ের আগেই চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়ার মতো কারণগুলো ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা বাড়িয়ে তোলে।

তিনি রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ ও মানসিক সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, তাদের ‘অস্পৃশ্য’ হিসেবে নয়, বরং সমাজের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ দীর্ঘ চিকিৎসা সফলভাবে শেষ করতে সামাজিক সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইডিসিএইচ) সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা (সেতু) বলেন, নিয়মিত ওষুধ সেবনের পরও দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাশি, জ্বর, বুকে ব্যথা বা ওজন কমার মতো উপসর্গের উন্নতি না হলে অথবা ওজন কমতেই থাকলে ডিআর-টিবি সন্দেহ করা উচিত।

তিনি বলেন, কয়েক মাস চিকিৎসার পরও কফ পরীক্ষায় জীবাণু পাওয়া গেলে তা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে প্রচলিত ওষুধ আর কার্যকর নয়।

ডা. শারমিন বলেন, আগে ডিআর-টিবির চিকিৎসা ছিল ১৮ থেকে ২৪ মাসের দীর্ঘ ও কষ্টকর প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিদিন ইনজেকশন নিতে হতো।

তিনি বলেন, এখন বাংলাদেশে সম্পূর্ণ মুখে খাওয়ার স্বল্পমেয়াদি চিকিৎসা পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে, যেখানে বেডাকুইলিন ও প্রিটোমানিড-এর মতো আধুনিক ওষুধের মাধ্যমে ছয় থেকে নয় মাসেই রোগ নিরাময় সম্ভব।

চিকিৎসায় অগ্রগতির পরও তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবনকে বড় হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, সাধারণ কাশির জন্য অনেকেই ফার্মেসি থেকে নিজেরাই অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খান, যা যক্ষ্মার জীবাণুকে আরও শক্তিশালী ও ওষুধ-প্রতিরোধী করে তোলে।

তিনি জানান, যারা নির্ধারিত চিকিৎসা পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করেন, তাদের মধ্যে চিকিৎসা-সফলতার হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত ইতিবাচক।

ডা. শারমিন তিনটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেন একদিনও বাদ না দিয়ে শতভাগ ওষুধ সেবন সম্পন্ন করা, স্বাস্থ্যকর্মী বা পরিবারের সদস্যের তত্ত্বাবধানে ডটস পদ্ধতিতে ওষুধ গ্রহণ করা এবং মনে রাখা যে আধুনিক পরীক্ষা ও ডিআর-টিবির সব ওষুধ সরকার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে সরবরাহ করে।

তিনি বলেন, সামাজিক বঞ্চনার ভয় যেন কাউকে চিকিৎসা নিতে নিরুৎসাহিত না করে। কারণ দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও নিয়মিত চিকিৎসাই সম্পূর্ণ সুস্থতার একমাত্র পথ।

আইসিডিডিআর,বি ও এনআইডিসিএইচ-এর জ্যেষ্ঠ মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. মো. শিরাজুল ইসলাম (সুমন) বলেন, ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মা মূলত মানুষের সৃষ্ট সমস্যা।

তিনি বলেন, এটি সাধারণত স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয় না; বরং অসম্পূর্ণ চিকিৎসা, অনিয়মিত ওষুধ সেবন এবং নিম্নমানের ওষুধ ব্যবহারের ফলে জীবাণু ওষুধ-প্রতিরোধী হয়ে ওঠে।

ডা. সুমন বলেন, অনেক রোগী সামান্য সুস্থ বোধ করলেই ওষুধ বন্ধ করে দেন। এতে শরীরে অবশিষ্ট জীবাণু টিকে থেকে ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলে।

তিনি আরও বলেন, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে অনেক রোগী চিকিৎসা বন্ধ করে দেন। এ ক্ষেত্রে নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ বন্ধ না করে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

জৈবিক কারণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

ডা. সুমন বলেন, সরকার বিনামূল্যে ওষুধ দিলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ এবং উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ খাদ্যের ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

তিনি বলেন, শক্তিশালী ওষুধের প্রভাব মোকাবিলায় রোগীদের ডিম, দুধ, মাছ ও মাংসের মতো পুষ্টিকর খাবার খাওয়া প্রয়োজন।

ডিআর-টিবি অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় তিনি ‘কাশির শিষ্টাচার’ মেনে চলার ওপর গুরুত্ব দেন। এর মধ্যে রয়েছে মাস্ক ব্যবহার, রুমাল দিয়ে মুখ ঢেকে কাশি দেওয়া এবং রোগীকে পর্যাপ্ত বাতাস চলাচল করে এমন কক্ষে রাখা, যাতে পরিবারের অন্য সদস্যরা সংক্রমিত না হন।

তিনি পরিবারের সদস্যদেরও নিয়মিত উপসর্গ পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোগীকে পুষ্টিকর খাদ্যের পাশাপাশি মানসিক সহায়তাও দিতে হবে, যাতে তিনি পুরো চিকিৎসা সম্পন্ন করতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিজ্ঞান ইতোমধ্যে যক্ষ্মার জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকর চিকিৎসা উদ্ভাবন করেছে। এখন রোগ নির্মূলে সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হলো অবহেলা, কুসংস্কার ও সামাজিক কলঙ্ক দূর করা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির অন্যান্য খবর