আর এটা আমাদের গলার নিচের দিকে, স্টার্নামের ঠিক ওপরে অবস্থিত। থাইরয়েড দেখতে অনেকটা প্রজাপতির মতো। এই গ্রন্থির দুটি অংশকে মাঝখানের একটি সরু অংশ যুক্ত করে রাখে। থাইরয়েড থেকে তৈরি হয় টিথ্রি ও টিফোর হরমোন, যা শরীরের বেসাল মেটাবলিক রেট বা বিএমআর নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সহজভাবে বললে, শরীর বিশ্রামে থাকা অবস্থায় কতটা শক্তি ব্যবহার করবে, তার ওপরও এই হরমোনগুলোর প্রভাব রয়েছে। এমনকি যখন থাইরয়েড অতিরিক্ত সক্রিয় হয় তখন তাকে হাইপারথাইরয়েডিজম বলা হয়। এতে শরীর বেশি ক্যালরি পোড়াতে পারে এবং ওজন কমে যেতে পারে। একইভাবে যখন আমাদের থাইরয়েড কম সক্রিয় হলে হাইপোথাইরয়েডিজম দেখা দেয়, যার ফলে বিপাকের হার কমে ও ওজন বাড়তে পারে। বর্তমানে অনেকেই এই সমস্যার মধ্যে দিয়ে যান আর সেটা তারা বুঝতেও পারেন না।
প্রজননেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
থাইরইয়েডের কাজ কিন্তু কেবল ওজন বাড়া-কমাতেই সীমাবদ্ধ নয়। জার্নাল অব এন্ডোক্রিনোলজিক্যাল ইনভেস্টিগেশন-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, থাইরয়েডের কার্যকারিতা নারী এবং পুরুষের প্রজনন ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। থাইরইয়েড ডিম্বাণুর ফলিকল বৃদ্ধি, নিষেক, ভ্রূণের প্রাথমিক বিকাশ এবং জরায়ুতে ভ্রূণের স্থাপনে সহায়তা করে। থাইরয়েড হরমোন ফলিকল-উদ্দীপক হরমোনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে ডিম্বাণুর ফলিকল বৃদ্ধিতেও সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, থাইরয়েড হরমোন নারীদের উর্বরতা, ডিম্বাণুর বিকাশ, ভ্রূণের প্রাথমিক বৃদ্ধি এবং জরায়ুতে ভ্রূণের সংযুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আর সে কারণেই হাইপোথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত অনেক নারীর মাসিক চক্রে অনিয়ম দেখা দিতে পারে। আবার হাইপারথাইরয়েডিজমও হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তন করে মাসিকের স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
পুরুষদের ক্ষেত্রে হাইপোথাইরয়ডিজম সাধারণত পুরুষ প্রজনন অঙ্গের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে না। তবে এটি চিকিৎসা না করলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এছাড়াও, হাইপোথাইরয়ডিজম শুক্রাণুর গঠনে পরিবর্তন আনতে পারে। এই রোগে আক্রান্ত পুরুষদের মধ্যে স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক গঠনের শুক্রাণু বেশি দেখা যেতে পারে।
মুড সুইয়ের ক্ষেত্রে প্রভাব
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা মস্তিষ্কের কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলতে পারে। হাইপোথাইরয়েডিজমের সঙ্গে বিষণ্নতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। পাশাপাশি উদ্বেগ, মুড সুইং, স্মৃতিশক্তির সাময়িক সমস্যা, মনোযোগের ঘাটতি ও ‘ব্রেইন ফগ’-এর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে হাইপোথাইরয়েডিজম বা হাইপারথাইরয়েডিজমের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং মেজাজের ওঠানামার মতো মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। জেএএমএ সাইকিয়াট্রি-তে প্রকাশিত একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, সাবক্লিনিক্যাল হাইপোথাইরয়েডিজম নয়, বরং হাইপোথাইরয়েডিজমের সঙ্গে ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনের মাঝারি মাত্রার সম্পর্ক রয়েছে, এবং এই সম্পর্ক পুরুষদের তুলনায় নারীদের ক্ষেত্রে বেশি শক্তিশালী।
এমনকি, থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্যহীনতা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও তথ্য ব্যবহারের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে ব্রেন ফগ, স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিতে ভুলে যাওয়া এবং মানসিক সতর্কতা বা মনোযোগ কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
থাইরয়েড আমাদের শরীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গনের একটি। এটি বিভিন্ন কাজ করে নীরবে। থাইরয়েডের ছোট্ট সমস্যাও অনেক সময় বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে। সে কারণে সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সময় নষ্ট করলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।