আজও আছে চমৎকার সব বিকেল। কিন্তু বিকেলের ডাকে আর চিঠিরা আসে না। প্রযুক্তির বাঁক বদলে কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছে হাতে লেখার ইচ্ছেটাই। আসলে, হাতে লেখার প্রয়োজনটাই পড়ছে না! ব্যাংক-পোস্ট অফিসে একটা সইয়ের জন্যই পকেটে কলম রাখেন অনেকে। এই কারণেই কি অকালে বুড়িয়ে যাচ্ছে মস্তিষ্ক? মগজের বার্ধক্য আসছে খুব তাড়াতাড়ি? এমনই দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।
ক্রমশ কাগজ-কলমহীন হয়ে উঠছে এখনকার প্রজন্ম। বুকপকেটের ডায়েরি ও কলম কবেই হারিয়ে গিয়েছে। এখন আর ও সব লাগে না, স্মার্টফোনই যথেষ্ট। বুকপকেটের সেই ডায়েরি কত কিছুর সাক্ষ্য বহন করত— কারও নাম-ঠিকানা, প্রতি দিনের কোনও না কোনও বিশেষ ঘটনা, পথ নির্দেশ, হিসাবনিকাশ ইত্যাদি। যদিও সেই ডায়েরি আজও আছে, আছে কলমও। শুধু হারিয়ে গেছে লেখার ইচ্ছেটা।
প্রযুক্তির যুগে ইমেল, হোয়াট্সস্যাপ— সবই কাগজ-কলমহীন। মোবাইল, ল্যাপটপ থেকে টাইপ করে মুহূর্তে হরেক তথ্য পৌঁছে দেওয়া যায় নির্দিষ্ট ঠিকানায়। ফর্ম ফিল-আপ থেকে পেমেন্ট— সব এখন অনলাইন।
লেখার দরকার কী, ফটোকপি করে নিলেই হল। তাতে সময় ও পরিশ্রম দুটোই বাঁচবে। ধৈর্য ধরে লেখার চলটা উঠেই যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আর তাতেই মরচে পড়ছে মস্তিষ্কের হিপ্পোক্যাম্পাসে। মগজের এই কুঠুরিটিই স্মৃতি, আবেগ, অনুভূতিগুলিকে ধরে রাখে। এই অংশের ধার কমলে, তখনই ভুলে যাওয়ার রোগ বাড়ে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দুশ্চিন্তার পাহাড় জমে, এমনকি বুদ্ধির বিকাশ থমকে যেতে পারে।
নরওয়েজ়িয়ান ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষণায় এমনটাই দাবি করা হয়েছে। একই রকম গবেষণা করেছে আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিও। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন সাইকোলজি’ নামক জার্নালে এ বিষয়ে গবেষণাপত্রও ছাপা হয়েছে।
বিশ্বের নানা দেশের ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উপর একটি সমীক্ষা চালানো হয়। তাঁদের ডিজিটাল মাধ্যম একেবারে এড়িয়ে চলে হাতে লেখার অভ্যাস করানো হয়। নির্দিষ্ট সময় ধরে তা করার পরে প্রত্যেকের ইইজি (ইলেকট্রোএনসেফ্যালোগ্রাম) স্ক্যান করা হয়। তাতে দেখা যায়, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের সক্রিয়তা বাড়ছে। হাতে লেখার সময় মস্তিষ্কে ‘থিটা’ এবং ‘আলফা’ তরঙ্গের কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এই তরঙ্গগুলি স্মৃতিশক্তি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত। এদের সক্রিয়তা বাড়লে, মানুষের মধ্যে সৃজনশীল ক্ষমতার বিকাশ হয়, বুদ্ধির ধারও বাড়ে।
হাতে লেখার অভ্যাসের লাভ আরও অনেক। এতে স্মৃতিশক্তির বিকাশ ঘটে, আবেগ নিয়ন্ত্রিত হয়। হাতে লেখার সময়ে চোখ, আঙুলের নড়াচড়া, হাতের নিয়ন্ত্রণ, স্পর্শের অনুভূতি এবং প্রতিটি অক্ষরের নির্দিষ্ট আকৃতি দেওয়ার বিষয়টি একসঙ্গে ঘটায় মগজের ব্যায়ামও হয়। যান্ত্রিক ভাবে টাইপ করলে যা হয় না।
তাই লেখা অভ্যাস করা ভালো। লেখার জন্য পড়তেও হবে। কোনও বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি নিজের উপলব্ধি লিখে ফেলা ভাল। হোক সেটা দুই বা চার কথায়। আজ যদি দু’কথা দিয়ে শুরু হয়, কাল চার কথায় প্রকাশ করা কঠিন নয়। প্রতি দিন অল্প অল্প করে লেখার অভ্যাস স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। দিনের একটা সময় থাকুক এর জন্য। ছোটদেরও তা অভ্যাস করানো ভাল। প্রতি দিন নিয়ম করে বাংলা ও ইংরেজি হাতের লেখা অভ্যাস করাতে হবে। অন্তত দু’পাতা করেও লিখতে দিন শিশুকে। ছুটির দিনে আরও বেশি। ভাল হয়, পাঠ্য বই থেকেই পাতা ধরে লিখতে দিলে। এতে পড়া হয়ে যায় এবং লেখার অভ্যাসও তৈরি হয়। এই অভ্যাস থাকলে পরীক্ষার সময়েও দ্রুত লিখতে সুবিধা হবে শিশুর।