মোবাইল ফোন ছাড়া এক মুহূর্ত যেন আমারা চিন্তা করতে পারি না। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও আগ্রহী হচ্ছে এই ফোন ব্যবহারে। এখন নানা বায়নাতে স্মার্ট ডিভাইসটি নিজের করে নিতে ব্যস্ত থাকে শিশুরাও। তাই ইচ্ছে না থাকলেও অনেক বাবা-মা বাধ্য হয়ে শিশুর হাতে তুলে দিচ্ছেন ফোন। এক সময় সেই ফোনই হয়ে ওঠে অভিভাবকের চিন্তার কারণ।
অয়নের বয়স মাত্র ৫ বছর। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া তার বাকিটা দিন কাটে মোবাইলে। সারাদিন কার্টুন আর গেম। এর ব্যতিক্রম হলেই বাড়ির লোকদের যেন এক মুহূর্তের জন্য টিকতে দেয় না। সবকিছুতে বিরক্ত হয় সে। মনোযোগ কমেছে পড়াশোনায়ও। তেমনই আরেক শিশু অহনা। বয়স হবে বছর তিনেক। তার সামনে ফোন না দিলে খাবার যেন কিছুতেই গলা দিয়ে নামে না। মুখে খাবার নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। মেয়েকে খাওয়ানো যেন পরীক্ষার সমান। তবে নিমেষে সমাধান হবে, যদি মোবাইলটি হাতে দিয়ে দেওয়া হয়।
শিশুদের এই আসক্তির কারণ কী?
এই স্মার্টফোনের আসক্তি শিশুর জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শুধুমাত্র মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব নয়, শরীরেও মোবাইলের খারাপ প্রভাব পড়ে। দীর্ঘ কোভিড পরবর্তী সময়ে শিশু-কিশোরদের স্মার্টফোনের নেশা বেড়েছে। ঘরবন্দি শিশুদের কাছে এখন এই ডিভাইসটি সব।
বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করা, খেলাধুলা, বই পড়া প্রভৃতির মাধ্যমে ধীর গতিতে আমাদের কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে। তবে মোবাইলে খেলা, ভিডিও দেখার সময় অতি সত্বর শিশুমনে আনন্দ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। তবে এতে হ্রাস পাচ্ছে কল্পনাশক্তি। টিভি, মোবাইল গেম বা যেকোনো ধরনের ভার্চুয়াল এন্টারটেইনমেন্ট দেখার সময়ে আমাদের মস্তিষ্কের কোষ থেকে ক্ষরণ হয়। এটি আসলে এক ধরনের নিউরোট্রান্সমিটার, যার নাম ডোপামিন। এই ডোপামিনের ক্ষরণ আমাদের মনে এক ভালো লাগার অনুভূতি সঞ্চার করে। ফলে অতি সহজেই তারা এসব মিডিয়ামগুলোতে আসক্ত হয়ে পড়ছে।
শিশুদের কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে?
বাইরে গিয়ে খেলাধুলা করা, গল্পের বই পড়া আজকাল শিশুরা প্রায় ভুলতে বসেছে। ফলে তাদের শরীরের সঙ্গে মনের বিকাশের অসামঞ্জস্যতা তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় স্মার্টফোনে চোখ আটকে থাকায় শিশুদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে। তাছাড়া আজকের দিনে সাইবার বুলিং একটি বড় সমস্যা। যা টিনএজারদের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিশুদের ওয়ার্কিং মেমোরি। একসঙ্গে কতগুলো ঘটনাকে আমরা মনে রাখতে পারি সেটাকেই বলে ওয়ার্কিং মেমোরি। কোনো গল্পের বই পড়ে সেটিকে পুনরায় বলতে পারাই ওয়ার্কিং মেমোরির ব্যায়াম। কিন্তু অতিরিক্ত ফোনের ব্যবহারের জন্য ঘুম কম হওয়ায় মনে রাখার ক্ষমতা, ভাবনার সৃষ্টি, চিন্তা করার সামর্থ্য লোপ পায়। এতে পড়াশোনার ক্ষেত্রেও ক্ষতি হয়।
অভ্যাস বদলের ভূমিকা রাখতে হবে অভিভাবকদের
শিশুর স্মার্টফোনে হাতেখড়ি হয় তার অভিভাবকই। তাই একমাত্র অভিভাবকরাই পারেন সন্তানকে মোবাইলের আসক্তি থেকে বের করে আনতে। সাধারণত বাবা-মা যা করেন, শিশু সেটা দেকেই শিখবে। এই আসক্তির পিছনে তাঁদের ভূমিকা কম নয়। স্মার্টফোন ছাড়াও শিশুদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অনেক কিছু রয়েছে। সেদিকে শিশুর ঝোঁক বাড়াতে হবে। কথা বলতে হবে, বাচ্চার চোখে চোখ রেখে। তার জন্য আপনার সন্তানের ভিতরের সুপ্ত প্রতিভা ও ইচ্ছাগুলো সম্পর্কে জানতে হবে। তবেই সেদিকে শিশুর ঝোঁক বাড়ানো সম্ভব।
শিশুর ঝোঁক বা আগ্রহ খুঁজতে হবে
যদিও শিশুর একবার মোবাইল আসক্তি হয়ে গেল, সেটি কাটানো খুব সহজ নয়। তাই তার প্রবল ঝোঁক বা আগ্রহের জায়গাটা খুঁজে বের করতে হবে। আর সেটি যেন হয় মোবাইলের সম বিকল্প ও আকর্ষণীয় জিনিস। সেই জিনিসটির প্রতি শিশুর আগ্রহকে বাড়িয়ে তুলতে পারলে, তবেই শিশুর মুঠোফোনের প্রতি আসক্তি কমবে। যেমন, ছবি আঁকা, গান গাওয়া বা কোনো বাদ্যযন্ত্রের প্রতি খুদের কৌতূহল। এসব আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দিতে হবে। তাহলে সে ফোনের স্ক্রিনের থেকে বেশি সময় এইসব কাজে ব্যস্ত থাকবে।
এছাড়া শিশুকে পড়াশোনার পাশাপাশি কম্পিউটার কোডিং ল্যাঙ্গুয়েজ শেখাতে পারেন। তাছাড়া বিভিন্ন রহস্য-রোমাঞ্চকর গল্পের প্রতি ঝোঁক তৈরি করাও খুব দরকার। তবেই সে ধীরে ধীরে মোবাইল ভুলে ভাল নেশায় আসক্ত হবে। তবে তার লাগাম থাকবে অবশ্যই অভিভাবকদের হাতে। শিশুর এগিয়ে চলার স্বচ্ছন্দ গতির উপর তাদের সুষ্ঠু বিকাশ নির্ভর করে। আর এর পরিকল্পিত রূপ দেওয়ার কারিগর হলেন বাবা-মা।
কথায় কথায় মোবাইল বা টিভি নয়
অনেকে আছেন সন্তানকে সময় না দিয়ে তার বদলে হাতে মোবাইল বা টিভিতে কার্টুন চালিয়ে দেন। এটা মোটেও ঠিক নয়। অনেক সময় একাকিত্বের কারণে মোবাইল ফোনের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে শিশু। তাই বাবা-মায়ের খেয়াল রাখতে হবে, স্মার্টফোন ব্যবহার করেও প্রতিদিনের কার্যকারিতা সঠিকভাবে করছে কিনা। যদি সেটি করে তবে দিনে ১-২ ঘণ্টা ফোন বা টিভি দেখার অনুমতি দিতেই পারেন।
বাড়িতে পড়াশোনা ও খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি
বাড়ির আবহে পড়াশোনা-খেলাধুলার পরিবেশ থাকা অত্যন্ত জরুরি। ঘরের ছোট্ট খুদেটির সঙ্গে বাবা-মায়ের কোয়ালিটি টাইম কাটানো দরকার। তার সঙ্গে খেলাধুলা করুন। কিছু সময়ের জন্য আপনার ড্রইংরুম বানিয়ে ফেলতে পারেন ফুটবলের মাঠ। রাখতে পারেন পাতলা ফুটবল। তাহলে ঘরের কোনো ক্ষতি হবে না। একটু সময় পেলে নিজেও বই পড়ার অভ্যাস করতে পারেন, তাহলে আপনার শিশুটিও তাই শিখবে।
ঘরে ফোনের ব্যবহার কমিয়ে দিন
বাড়িতে এলে যতটা পারবেন ফোন কম ব্যবহার করুন। এছাড়া রাতে ঘুমানোর অন্তত একঘণ্টা আগে ও সকালে ঘুম ভাঙার পর ফোন ব্যবহারে বিরত থাকুন। বাড়ির প্রত্যেক সদস্য স্মার্টফোনবিহীন একটি দিন কাটানোর চেষ্টা করুন। সেদিন সবাই শিশুটির সঙ্গে সময় কাটান। দেখবেন তারও স্মার্টফোন নির্ভরশীলতা কমে এসেছে। স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের প্রতি নির্ভরশীলতা বাড়লে শিশুর আনন্দ ক্রমেই কমতে থাকে। ওদের মুঠোফোনের বাইরের পৃথিবীর সংস্পর্শে রাখা অভিভাবকদের দায়িত্ব।